বিভাষ দত্ত, নিজস্ব প্রতিবেদক : নির্মোহ জীবনের নীরব পদচিহ্ন এঁকে চলছিলেন ফরিদপুরের প্রবীন শিক্ষক ও সাংবাদিক জগদীশ চন্দ্র ঘোষ, যাকে এই নামের চেয়ে তারাপদ স্যার নামেই চেনেন বেশীরভাগ মানুষ। তারাপদ স্যার বৃষ্টিশ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রাণে বেঁচে গেলেও বৈশিক মহামারি করোনায় থমকে গেলেন তিনি। চলে গেলেন পরোপারে। করোনার প্রারম্ভেই তাকে আটকে দেওয়া হয়েছিল বাড়িতে। তারপরও শেষ রক্ষা হলো না। ২ মার্চ শুক্রবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে শেষ নিশ^াস ত্যাগ করেন তিনি।

বৃষ্টিশ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রাণে বেঁচে গেলেও করোনায় থেমে গেল তারাপদ স্যারের প্রাণ
স্যারের বয়স ৯৩। নিবেদিত শিক্ষক ও সাংবাদিক হিসেবে জীবনের এত দীর্ঘসময় পেরিয়ে ক্লান্ত হননি কখনও। হাসি মুখ ছাড়া তারাপদ স্যারকে দেখা যায় না কোথাও। কারো সাহায্য ছাড়াই একা চলতে পছন্দ করেন তিনি। সার্বক্ষনিক সঙ্গী ছিলো তার একটি ছাতা।
সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই প্রবীন সময় কাটাতেন জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে। হাজারো ছাত্র-ছাত্রীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় আরো অনেকদিন বেঁচে থাকার ইচ্ছা ছিলো তার। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন বয়স, শ্রেণী, পেশার ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিনিয়ত তার খোঁজ নিতেন তার। দেখতে যেতেন শহরের ঝিলটুলী এলাকায় স্যারের বাড়িতে। নীচ তলায় তার কক্ষে একাই থাকতেন তিনি। এই জ্ঞান পিপাসুর ঘরময় ছড়িয়ে থাকতো বই, পত্রিকা, ম্যাগাজিন।

বৃষ্টিশ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রাণে বেঁচে গেলেও করোনায় থেমে গেল তারাপদ স্যারের প্রাণ
বিএ পাস করার পর থেকে তার শিক্ষকতা জীবন শুরু। বিভিন্ন স্কুলে চাকরি করেছেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত টানা তিন যুগ তিনি ছিলেন ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি অবসরে যান। গণিত ও ইংরেজীতে দক্ষ ছিলেন এ শিক্ষক। অকৃতদার প্রবীণ এ ব্যক্তিত্বের অফুরান প্রাণশক্তি মুগ্ধ করতো নবীনদের। সৎ ও বস্তুনিষ্ট সাংবাদিকতার পথিকৃত তিনি। ফরিদপুর প্রেসক্লাব ও ফরিদপুর টাউন থিয়েটারে নিয়মিত যাতায়ত করতেন এবং নেতৃত্ব দিতেন বিভিন্ন কর্মকান্ডে।
ধীর-স্থির ও প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এ প্রবীণের অকুতোভয় স্বভাব শৈশব থেকেই। ১৯৪২ সালে তিনি যখন ১২ বছরের কিশোর, তখন ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের নেতাদের সহকারী হিসেবে কাজ করার দায়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন। স্বদেশী নেতা ডা. সুবোধ সরকারের ভাতিজা আশুতোষ সরকারের নেতৃত্বে তখন এক হয়েছিল ফরিদপুরের ঈশান গোপালপুরের যুবক-তরুনরা। গোপনে তাদের লাঠি খেলা, তীর ছোঁড়া ও নানা শারিরিক কসরত প্রশিক্ষণ চলতো। কিশোর জগদীশ ভিড়েছিলেন সেই কিশোরদের দলে। তৎকালীন ফরিদপুরের সিআইডি ইন্সপেক্টর সন্তোষ দাসগুপ্ত কোনো এক রাতে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেন জগদীশ চন্দ্র ঘোষ ও তার কাকা নরেশ চন্দ্র ঘোষকে। ১৫ দিনের হাজতবাসের পর তারা মুক্তি পেয়েছিলেন।

বৃষ্টিশ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রাণে বেঁচে গেলেও করোনায় থেমে গেল তারাপদ স্যারের প্রাণ
১৯৭১ সালে ফরিদপুরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের প্রথম শিকার হয় তারাপদ স্যারের পরিবার। নৃশংস এই হত্যাকান্ডে শহীদ হন তারাপদ স্যারের আপন ভাই গৌর গোপাল ঘোষ, কাকাতো ভাই বাবলু ঘোষসহ তাদের বন্ধু পরিবার জমিদার ঈশান সরকারের পরিবারের সদস্য এবং ফরিদপুর থেকে ওই বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিরা।
পাকিস্তানী বাহিনীর মূল টার্গেট ছিল প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত দুই সহোদর জগদীশ চন্দ্র ঘোষ ও তার অনুজ ফরিদপুর মহকুমা ন্যাপের সাংগঠনিক সম্পাদক চিত্তরঞ্জন ঘোষ। ঘটনাক্রমে প্রানে বেঁচে যান তারা। শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা, ক্রেস্ট, মেডেল, স্মারক ও মানপত্র।
You cannot copy content of this page
Leave a Reply