আলমগীর জয় : ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেছেন, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশপাশি খেলাধুলাসহ এক্সটা কারিকুলামে দক্ষ হতে হবে। মেধাবীদেরকে ভবিষ্যত নেতা হিসেবে তৈরী করা করতে হবে। তিনি আজ ৩০ নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ মঙ্গলবার ফরিদপুর জেলা প্রশাসন আয়োজিত “জ্ঞানের আলো ট্রাস্ট” পদক বিতরণ ও “মিট দ্য ডিসি’র” শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনীতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন।
জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, আমরা এমন একটি সমাজ বিনির্মান করতে চাই যেখানে শিক্ষার্থীরা পরিবারের সেবা করা, পরিবারের প্রতি লক্ষ্য রাখাসহ আশেপাশে সবার প্রতি লক্ষ্য রেখে পুরো সমাজটাকে পাল্টে দেবে। যে সমাজে মেয়েরা নিরাপদ থাকবে, শঙ্কার মধ্যে থাকতে হবে না। মেয়েরো যেকোন ভাল কাজ নির্বঘ্নে করতে পারবে। আমাদের সেই ধরণের সোসাইটি নির্মান করতে হবে। কারন আমার মেয়েরা যদি ভাল থাকে তাহলে ভাল একটা সমাজ পাবো। একটা পরিবার পাবো এবং অবশ্যই ভাল একটি দেশ পাবো। জেলা প্রশাসক আরো বলেন, আমাদের উদ্যমশীল ছেলেদের দরকার; যারা বিশেষগুনে গুনান্বিত হবে এবং সমাজকে সুরক্ষিত রাখবে। ছেলে এবং মেয়ে মিলে এ ধরণের সমাজ যখন বির্নিমান করতে পারবো তখনই আমাদের দেশ পৃথিবীতে নেতৃত্ব দিতে পারবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ সাইফুল কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন সহকারী কমিশনার (গোপনীয়) তারেক হাসান। বক্তব্য প্রদান করেন সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর অসীম কুমার সাহা, সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর কাজী গোলাম মোস্তফা, জেলা শিক্ষা অফিসার বিষ্ণু পদ ঘোষাল, বাকিগঞ্জ ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মওলানা মাহমুদুল হাসান, শিক্ষক সাবিনা জামান প্রমুখ বক্তব্য প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে তিনজন গুনী শিক্ষককে পদক প্রদান করা হয়। এরা হলেন সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজভী জামান, ফরিদপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক অপূর্ব কুমার দাস ও বোয়ালমারী ত্রিপল্লী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিক সুবর্ণ লিপা। এদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট, সার্টিফিকেট ও সম্মানী তুলে দেন জেলা প্রশাসকসহ অতিথিবৃন্দ। পদক প্রাপ্তরা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তব্য প্রদান করেন। এর আগে মিড দ্য ডিসি’র শিক্ষার্থী ইব্রাহিম আদম, সুবর্ণা ইসলাম মিম, প্রভাতী নূর পুনর্মিলনী উপলক্ষে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোসাঃ তাসলিমা আলী, রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) তানিয়া আক্তার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তৌহিদুল ইসলামসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য সংস্কৃতির পরিপূর্ণ বিকাশের উজ্জ্বল ক্ষেত্র গ্রন্থমেলা সভ্যতার অগ্রযাত্রায় অন্যতম শক্তিশালী সোপান। শিক্ষার প্রতি ফরিদপুরবাসীর অনুরাগ সুবিদিত। মাতৃভাষার জন্য পরম আত্মত্যাগ ও মমত্ববোধ বাঙালী জাতিকে দিয়েছে অমিত সাহস,অশুভকে পরাভূত করার দুর্জয় প্রত্যয়। এই চেতনাকে ধারণ করে ফরিদপুরকে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করার মানসে ২০২০ সনে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের প্রাক প্রস্ততিমূলক সভায় ফরিদপুর জেলায় প্রথম বারের মত সকলের সংশ্লিষ্ঠতার মাধ্যমে গ্রন্থ মেলা আয়োজনের প্রস্তাবনা উত্থাপন করলে সভায় উপস্থিত ফরিদপুর জেলায় সর্বস্তরের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষকমন্ডলী, সাংবাদিক সহ সকলে এ প্রস্তাবে স্বতঃস্ফুর্ত সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং গ্রন্থমেলার সফল বাস্তবায়নে সকল ধরনের সহযোগিতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। ফলশ্রুতিতে ২০২০ সালে ১৪-২১ ফেব্রুয়ারি “আট আনায় জীবনের আলো কেনা” থিমের উপর ভিত্তি করে আড়ম্বরপূর্ন পরিবেশে ফরিদপুরের সর্বস্তরের মানুষ বিশেষত শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ঠতায় বৃহৎ কলেবরে “প্রথম গ্রন্থ মেলা” উদযাপিত হয়। এই মেলা জনমনে এক নব উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। দাবি ওঠে মেলার অমরত্বের জন্য। জ্ঞান পিপাসু মানুষের আকাঙ্খার বাস্তব রূপায়নের লক্ষ্যে প্রতিবছর অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে এই গ্রন্থ মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রতিবছর নিয়মিত গ্রন্থমেলা আয়োজন করার জন্য ফরিদপুর জেলাধীন প্রতি শিক্ষার্থীর নিকট হতে স্বেচ্ছায় “আট আনা (পঞ্চাশ পয়সা)” করে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর উদ্দেশ্য মেলার মালিকানাসত্ত্ব শিক্ষাথীদের হাতে তুলে দিয়ে এই মেলাকে শিক্ষার্থীদের প্রাণের মেলায় পরিনত করা এবং শিক্ষার্থী ও গ্রন্থমেলার মধ্যে নিবিড় বন্ধন তৈরী করা যাতে করে জ্ঞান পিপাসু শিক্ষার্থীরা বই পড়ার মধ্য দিয়ে তাদের অন্তরের দিব্য নয়ন বিকশিত করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানিক রূপায়ন এবং শিক্ষার্থীদের নিকট হতে সংগৃহীত অর্থের সদ্ব্যব্যবহারের লক্ষে শিক্ষার্থী ও জ্ঞান পিপাসু সন্মানিত নাগরিকদের নিকট হতে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে একটি ট্রাস্ট গঠেনর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই ট্রাস্টের নামকরণ করা হয় ফরিদপুর জ্ঞানের আলো ট্রাস্ট। প্রত্যক শিক্ষার্থীর নিকট হতে “আট আনা (পঞ্চাশ পয়সা)” যা বছরে ০৬ টাকা হয় তার মধ্যে ০৫ টাকা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্ঞানের আলো ট্রাস্ট এর ব্যাংক একাউন্টে এবং অবশিষ্ঠ ০১ টাকা ব্যবস্থাপনা খরচ বাবদ স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্টানে সঞ্চিত থাকবে। এর বিনিময়ে গ্রন্থমেলার স্বত্ত্ব শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হবে। শিক্ষাথী ব্যতীত আগ্রহী যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই জ্ঞানের আলো ট্রাস্টে তাদের অনুদান প্রদান করতে পারবেন। এখানে উল্লেখ যে, এই ট্রাস্টের অনুরুপ একটি ট্রাস্ট সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায় বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমান (২০২০) জেলাপ্রশাসক, ফরিদপুর যখন উল্লাপাড়া উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন তখন (২০০৯-২০১৩) উল্লাপাড়ার জ্ঞানের আলো ট্রাস্ট ও “আট আনায় জীনের আলো কেনা’’ প্রতিপাদ্যর মধে দিয়ে গ্রস্থমেলা ও ট্রাস্টের কার্যক্রমের সূচনা ঘটে যা অদ্যবদি অব্যাহত রয়েছে। জ্ঞানের আলো ট্রাস্ট এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ফরিদপুর জেলায় প্রতিবছর গ্রন্থমেলার আয়োজন করা এবং শিক্ষার্থীদের অনুদানের আট আনা নির্বাহের পর গ্রন্থমেলার খরচ ফরিদপুর জেলার সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্য হতে প্রতিবছর শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষককে “ফরিদপুর গ্রন্থ মেলা পদক” এবং বিভিন্ন স্তরের ১০০ জন মেধাবী ও দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীকে এক বছর মেয়াদি “শিক্ষা বৃত্তি” প্রদান করা। ট্রাস্টের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি সাপেক্ষে বৃত্তি প্রদানের সংখ্যা ও অর্থের পরিমান বৃদ্ধি করা যাবে। গ্রন্থমেলার মাধ্যমে একদিকে এই জনপদের মানুষ যেমন অধিকতর আলোকিত হবে তেমনি শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ “ফরিদপুর গ্রন্থমেলা পদক” অর্জনের জন্য তাদের সার্বিক মানের উৎকর্ষ সাধনেও আরো মনযোগী হবেন। মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীরা শিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে তাদের শিক্ষা জীবনকে সুগম ও সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবে। জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হবে জীবনের আলো।
অন্যদিকে ফরিদপুর জেলা প্রশাসক জনাব অতুল সরকারের নিজস্ব চিন্তাপ্রসূত উদ্ভাবনী পরিকল্পনা ‘মিট দ্যা ডিসি’; যা প্রতি ইংরেজি মাসের প্রথম শুক্রবার জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অুনষ্ঠিত হয়। নিজ নিজ স্কুলের শিক্ষার মান ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষকদের শিক্ষা দান পদ্ধতির উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ, নিজ জেলার উল্লেখযোগ্য বিষয়াবলী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য বিষয়াবলী সম্পর্কে জ্ঞান সমৃদ্ধ হওয়া, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত স্বপ্ন সফল হতে সহায়তা, ২০৪১ সালের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে ভূমিকা রাখার প্রত্যশায় ‘মিট দ্যা ডিসি’ অনুষ্ঠিত হয়।
You cannot copy content of this page
Leave a Reply